তুষারের মৃত্যু আর নিজের শিহরে উঠা বনানী ট্রাজেডি

স্পোর্টসমেইল২৪ ডেস্ক স্পোর্টসমেইল২৪ ডেস্ক প্রকাশিত: ১২:২৪ পিএম, ২৯ মার্চ ২০১৯
তুষারের মৃত্যু আর নিজের শিহরে উঠা বনানী ট্রাজেডি

নিহত তুষার (বামে) এবং খান নয়ন (ডানে)

রাজধানীর বনানীর বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি এক ক্রিকেটারের মৃত্যু হয়েছে। মাগুরার নাহিদুল ইসলাম তুষার নামের এই ক্রিকেটার স্থানীয় ক্রিকেটে লিগে নিয়মিত খেলতেন।

তুষারের মৃত্যু নিয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের ম্যানেজার খান নয়ন নিজের ফেসবুক পেইজে দীর্ঘ একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিহত তুষারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন।

খান নয়নের ফেসবুকে স্ট্যাটাস এখানে তুলে ধরা হলো-

তুষারের মৃত্যু আর নিজের শিহরে উঠা বনানী ট্রাজেডি..

আমি তখন চাকুরিচ্যুত, হন্য হয়ে কাজ খুঁজছি। অফিস থেকে “দায়িত্ব অবহেলা ও কর্মে সন্তুষ্টি না হওয়াই আপনাকে অব্যাহতি প্রদান করা হল এমন কিছু কথা লিখে একটি টার্মিনেশন লেটার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি একদম বিচলিত নই। চুপচাপ কাজ খুঁজি।

হঠাৎ ডেইলি স্টারের এক সাংবাদিক বড় ভাই বললেন, বনানীতে এক পত্রিকা অফিসে ইন্টারভিউ দিতে। আমি চলে গেলাম একখানা সিভি হাতে করে। যেয়ে দেখি সেই পত্রিকা অফিসে কেউ আসেনি, শুধু পিয়ন ছাড়া। নতুন অফিস স্টাফ সব নিয়োগ হয়নি। আমাকে বলা হল বসতে হবে, স্যার আসতে দেরী হবে!! নতুন পত্রিকা অফিস ১৭ তলার উপরে।

আমি বসে আছি, হঠাৎ পিয়ন দৌড়ে এল। বলল, যেভাবে পারেন পালিয়ে যান। আগুন ধরেছে। পিয়ন উধাও, আমি কিছুক্ষণ ভেবে নিচে নামবার চেষ্টা করলাম। আশপাশে কাউকে দেখছি না। সিঁড়ি বেয়ে নামার চেষ্টা করছি। ৯ তলার আগ পর্যন্ত সম্ভব হল আর পারলাম না। চারদিকের ধোঁয়ার কুন্ডুলি পাকিয়ে উপরে উঠছে। আমার বুঝতে বাকি নেই, আমি উপরে উঠার চেষ্টা করছি শরীর আর চলে না। শুধু মন ঠিক মত নিজেকে সাহস যোগাচ্ছে বাঁচার উত্সাহে।

কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলাম বড় কোন বিপদের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আগুনের কি অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছি না। তখন মনে হল আজ হতে পারে জীবনের শেষ দিন।

নিজেকে খুব ঠান্ডা ঠান্ডা মনে হচ্ছিল। খুব স্বাভাবিক ছিলাম। তখন মাথায় এল আমি যে ইন্টারভিউ দিতে আসছি সেটা তো কেউ জানে না।

তখন সেই পত্রিকা অফিসের মধ্যে ঢুকলাম। কেউ নেই। মোবাইলে নেটওয়ার্ক চলে গেছে। আমি ল্যান্ডফোন তুলে কাউকে ফোন করবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ততক্ষণে ফোনের সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মোবাইল ফোন এর নেটওয়ার্ক বেশ ডাউন, বেশ কিছুক্ষণ পর নেটওয়ার্ক পেলাম কোন রকমে।

কাকে জানাব বিষয়টি!!
ছোট বেলার মাগুরার এক বন্ধু কে ফোন করলাম। প্রথমে তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলাম খুব সুন্দর সহজ ভঙ্গিতে। এবার বললাম বন্ধু তুমি কি একটু কাগজ কলম হাতে নিতে পারবে! সে বলল হ্যা, আমি বললাম আমি যা বলব তুমি লিখবে। একটুও ঘাবড়াবে না কিন্তু...

সেই বন্ধুটি খুব যত্ন করে পুরো ঘটনা লিখতে শুরু করল। আমি প্রথমে অফিসের লোকেশন, আমার বর্তমান অবস্থান কোথাই, কেন এবং কি কারণে এখানে এসেছি সেটা বললাম। তারপর বললাম, আমার পরনে কি আছে, কি রং এর পোষাক ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় স্পষ্ট জানালাম।

শুধু বন্ধুটিকে বললাম, যদি আগুন থেকে জীবন নিয়ে না ফিরতে পারি, অনন্ত আমার মৃত লাশ যেন পরিবার খুঁজে পেতে পারে এজন্যই তোকে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে জানালাম।

আমার বন্ধু ফোনের ওপারে কাঁদছে। আমি কিছু বলছি না, তখন শুধু বেশ কিছু পরিবারিক এবং ব্যক্তিগত বিষয় তাকে বললাম। এরপর আবার ফোনের সংযোগ কেটে গেল নেটওয়ার্ক না থাকায়।

একা একটি রুমে আমি ২ ঘন্টা মত অবরুদ্ধ থাকলাম। এরপর ফায়ার সার্ভিসের লোক এসে বলল সাবধানে নেমে যেতে। সিড়িতে পানি আর পোড়া গন্ধ।

বনানীর ঐদিনের কথা আজ খুব মনে পড়ছে। টিভির পর্দায় দেখছিলাম। ৪.৫ বছর মত আগের কথা এইটা।

আজ ২৮ মার্চ রাত ১০:৩০ মি. অভি ফোন করল। বলল, আমাদের মাগুরার এক বন্ধু তুষার বনানীতে আজ আগুনে পুড়ে মারা গেছে। এই তুষার হল যে বাঁ হাতি পেস বোলার ছিল। আমরা সবাই লেফটি তুষার বলে তাকে ডাকতাম। মাগুরা জেলা টিমের ক্রিকেটার ছিল। স্টেডিয়ামের অপর পাশে আদর্শ পাড়াতে থাকত ওরা। তুষারের বাবার চাকুরির সুবাদে মাগুরা থাকত। দারুণ এক হাসিখুশি বিনয়ী ছেলে। পরিচিত মুখ

সকল নিহতদের আত্বার মাগফেরাত কামনা করছি। আহতের জন্য দোআ। লেফটি তুষারকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জান্নাতে দান করুন। ওর মৃত দেহ এখন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রয়েছে বলে বনি আমিন অভি জানাল।

শুধু মনে পড়ছে, এমন মৃত ঘটনার শিরোনাম তো আমিও হতে পারতাম।
হয়তো আপনাদের দোআ’তে আজ আমি..

লেখক- খান নয়ন, ম্যানেজার, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স


শেয়ার করুন :


আরও পড়ুন

বনানীর অগ্নিকাণ্ডে এক ক্রিকেটারের প্রাণহানী

বনানীর অগ্নিকাণ্ডে এক ক্রিকেটারের প্রাণহানী

মানবতায় এগিয়ে আসার আহবান মাশরাফির

মানবতায় এগিয়ে আসার আহবান মাশরাফির

এশিয়া কাপ আরচারির ফাইনালে বাংলাদেশের রোমান

এশিয়া কাপ আরচারির ফাইনালে বাংলাদেশের রোমান

আইটিএফ দলভুক্ত হলেন রুমান-মাসফিয়া-আলভি

আইটিএফ দলভুক্ত হলেন রুমান-মাসফিয়া-আলভি