স্টিভেন স্মিথ, স্পিনার থেকে বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান

পার্থ প্রতীম রায় পার্থ প্রতীম রায় প্রকাশিত: ০৬:২১ পিএম, ০২ জুন ২০২১
স্টিভেন স্মিথ, স্পিনার থেকে বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান

অ্যাশেজের ইতিহাসে এক সিরিজে স্যার ডন ব্যাডম্যানের (৯৭৪) এর পর দ্বিতীয় রান সংগ্রাহক (৭৭৪) কে জানা আছে? তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন অজি মাস্টার ব্লাস্টার স্টিভেন স্মিথ।

২০১০ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি, তেমন কোন মনে রাখার মত তারিখ না। স্টিভ স্মিথ এর জন্য স্মরণীয় দিন কারণ এ দিনেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তার।আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার যাত্রা শুরু মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে পাকিস্তানের সাথে টি-২০ তে লেগস্পিনার হিসাবে যে কিনা একটু আধটু ব্যাটিং ও করতে পারে।

সীমিত ওভারের ক্রিকেটের আগে টেস্ট দলে জায়গা হয়েছিল তার। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে নাথান হরিজের বদলি হিসেবে লেগ স্পিনার স্টিভ স্মিথকে দলে নেয় টিম অস্ট্রেলিয়া। তখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে স্টিভ স্মিথ এর বোলিং গড় ছিল জানেন? প্রায় ১০০ এর কাছাকাছি।এরপরেও ব্যাটিংয়ের থেকে লেগ স্পিনের দিকেই বেশি নজর দিয়েছিলেন তিনি। কারণ তিনি চাইতেন ব্যাটসম্যান নন, হবেন একজন লেগ স্পিনার। তার নাম উচ্চারিত হবে শেন ওয়ার্নের উত্তরসূরী হিসেবে।

sportsmail24

স্টিভ স্মিথের টেস্ট অভিষেক কিন্তু হটাৎ। খুব ভালো কোনো পারফর্মার হিসেবে তাকে জাতীয় দলের জার্সি তুলে দেওয়া হয়নি। বরং, তার চেষ্টা আর একনিষ্ঠতা দেখেই নির্বাচকরা দলে ডেকে নেন। ১৩ ওডিআই আর ৫ টি-২০ তে আহামরি পারফরম্যান্স না থাকলেও লর্ডসে পাকিস্তানের সাথে টেস্টে নামিয়ে দেয়া হয় তাকে দানিশ কানেরিয়ার কাউন্টারপার্ট হিসেবে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জয়ে ভালো ভূমিকা রাখেন ও তিনি। পরের টেস্টে বোলার স্মিথ ফ্লপ গেলেও ব্যাটসম্যান স্মিথ আটে নেমে করেন ৭৭ রান। স্মিথের এ ইনিংসের পরও দলকে জেতাতে পারেননি।

২০১০-১১ অ্যাশেজে ৩য়, ৪র্থ আর ৫ম টেস্টে স্মিথ ৬ষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে দলে সুযোগ পান। যে কিনা দলের প্রয়োজনে বোলিং করবে। তবে কোনো দিক থেকেই সফল না হওয়ায় অস্ট্রেলিয়া দল থেকে বাজে তার বিদায় ঘন্টা।

দলে থেকে বাদ পড়ার পর স্টিভ স্মিথের জন্য শুরু হয় নতুন এক লড়াই। জাতীয় দলে জায়গা ফিরে পাওয়ার লড়াই। যেটাকে পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়া মিডিয়া আখ্যায়িত করে "HardworkGate" হিসেবে। দল থেকে বাদ পরার পর একা নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন। সব চিন্তা শেষে সিদ্ধান্তে আসেন ছোটবেলার স্বপ্ন লেগস্পিনকে বাদ দিবেন। আর মনোনিবেশ করবেন নিজের ব্যাটিংয়ে। ব্যক্তিগত কোচ ট্রেন্ট উডহিল এর সাথে দিনের পর দিন নিজের ব্যাটিং নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। তার প্রথম এপ্রোচ ছিল নিজের আনঅর্থোডক্স টেকনিককে বিশ্বাস করা এবং অন্যদের কথায় নিজের টেকনিকে পরিবর্তন না করা। এ ভুলের মাশুল হিসেবে ২০১০/১১ অ্যাশেজে খারাপ পারফর্মেন্স করেন তিনি। জাতীয় দলের কোচের কথা শুনে নিজের টেকনিকে ভালো করার চেষ্টা করেন।

ব্যাটিং টেকনিক পরিবর্তনের ফলাফল কি ছিল জানেন? ৬ ইনিংসে সর্ব সাকুল্যে একটি অর্ধ শতক। তাই এবার থেকে নিজের স্বতন্ত্র টেকনিকে নিজেকে বহাল রাখার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলেন। প্র্যাকটিস করতে থাকলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা; বেডরুম, বাথরুম, করিডোর, বারান্দা কোথাও শ্যাডো ব্যাটিং করা বাদ রাখেননি।

sportsmail24

স্মিথের পরিশ্রমের ফল মিললো দল থেকে বাদ পড়ার দুই বছর পর ২০১৩ সালে। ডাক পান ভারতের বিপক্ষে মোহালি টেস্টে। স্পিনিং উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে ৯২ রান করেন। তার এ ইনিংসের কারণে দল হার এড়াতে না পারলেও নির্বাচকদের মন কাড়েন তিনি।আর এ কারণেই লোয়ার মিডল অর্ডার থেকে তাকে তুলে নিয়ে আসা হয় টপ অর্ডারে।

ফলাফল ২০১৩ অ্যাশেজে আবারও ফিরলেন স্টিভ স্মিথ। তাকে নিয়ে গণমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। একটা পত্রিকা তো লিখেই ফেললো, "We should have rather sent a Donkey to England than Steve Smith."

মুখে কোনও উত্তর না দিয়ে নিজের কাজটা করে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়া দল প্রত্যাশা মাফিক খেলতে না পারলেও ব্যতিক্রম ছিলেন স্টিভ স্মিথ। অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে অ্যাশেজ শেষ করেছিলেন। ওভাল টেস্টে ১৩৮ রানের একটি অসাধারণ ইনিংস ইনিংস সহ করেছিলেন ৩৪৫ রান।

একই বছরের শেষে ইংল্যান্ড অ্যাশেজ খেলতে পাড়ি জমায় অস্ট্রেলিয়ায়। ইংল্যান্ডকে ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয়। পার্থ আর সিডনি টেস্টে সেঞ্চুরি করে সিরিজ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন। এ সিরিজের পার্থ টেস্ট স্মিথ তার শর্ট বলে বিখ্যাত ব্যাকফুট পুল শট খেলা শুরু করেন।

এখানে বসে থাকেননি স্টিভ স্মিথ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০১৪ সালের সিরিজে তিন ম্যাচে টেস্ট সিরিজে স্টেইন, ফিল্যান্ডার, মরকেলের ভয়ঙ্কর বোলিং লাইনআপকে মামুলি বানিয়ে সেঞ্চুরি সহ করেন ২৬৯ রান। আর এতে গড় ছিল ৬৭.৫৫।

একই বছরের শেষের দিকে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে সিরিজে নিজেকে আরও উপরে তুলে তুলে নেন। এ সিরিজে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে জিতে নেয় ২-০ ব্যবধানে আর স্মিথ হয়েছিলেন সিরিজ সেরা। চার ম্যাচের সিরিজে স্মিথ ১২৮ গড়ে করেন ৭৬৯ রান। তার রান ছিল ১৬২*, ৫২*, ১৩৩, ২৮, ১৯২, ১৪, ১১৭ এবং ৭১।

ঘরের মাঠে ২০১৫ বিশ্বকাপে নিজেকে ওয়ানডেতেও সেরা প্রমাণ করে তোলেন। একট সেঞ্চুরি আর চারটি অর্ধশতকে সাত ইনিংসে ৬৭ এভারেজে ৪০২ রান করেন তিনি। এর ফলে এ আসরে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন স্মিথ। সাথে দলের বিশ্বকাপ জয়ে বড় ভূমিকা। এর মধ্যে সেমি ফাইনালে ভারতে বিপক্ষে ছিল ১০৫ রানের এক অনবদ্য ইনিংস। আর এ বিশ্বকাপে স্মিথের অসাধারণ ফিল্ডিং নজর কেড়েছে ক্রিকেট বোদ্ধাদের। কেউ ধারণা করতে পারেনি এত দূর্দান্ত ফিল্ডিং করতে পারেন তিনি। অসাধারণ সব ক্যাচ আর রানআউট করে ফিল্ডার হিসাবেও তিনি কতটা ভালো তার প্রমাণ রাখেন এ বিশ্বকাপে।

বিশ্বকাপের বছরে অনুষ্ঠিত অ্যাশেজের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নেন অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। ক্লার্কের উত্তরসূরি হিসেবে স্টিভ স্মিথকে নির্বাচন করা হয়। সময়ের কি লীলাখেলা! দুই বছর আগেই যাকে গাধার চেয়েও অধম বানিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যম সেই কিনা দুই বছরের মাথায় জাতীয় দলের অধিনায়ক!

sportsmail24

অধিনায়ক হিসেবে বিদেশের মাটিতে অপ্রতিরোধ্য ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে টেস্টে উঠে আসেন র‍্যাঙ্কিংয়ের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে। ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে ছিল অধিনায়কত্বের সফলতা।

২০১৭ তে ভারত সফর ছিল স্মিথের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। র‍্যাঙ্কটার্নার উইকেটে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ। দল ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারলেও চার ম্যাচ সিরিজে তিন সেঞ্চুরিসহ ৭১ এভারেজে করেন সিরিজ সর্বোচ্চ ৪৯৯ রান করেন। সাথে জানান দেন যে পেস সহায়ক উইকেটের পাশাপাশি র‍্যাঙ্কটার্নার উইকেটেও খেলতে একইভাবে পারদর্শী।

সে বছরের শেষে ঘরের মাঠে অ্যাশেজে স্মিথ একাই ইংল্যান্ডকে পিষে ফেলেন। পাঁচ ম্যাচ টেস্ট সিরিজে তিন সেঞ্চুরি, এক ডাবল সেঞ্চুরি আর দুই ফিফটিতে ১৩৭ এভারেজে করেন ৬৮৭ রান। তুলনা শুরু হয় স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে। যেখানে ভেবেছিলে তাকে তুলনা করা হবে শেন ওয়ার্নের সাথে, সেখানে তুলনা পাচ্ছিলেন ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে!

এরপরই আসে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টে বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন স্টিভ স্মিথ। আইসিসি দুই টেস্ট নিষিদ্ধ করলেও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তাকে এক বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে। সাথে অধিনায়কত্ব থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

তবে নিষেধাজ্ঞার সময়েও তিনি বসে থাকেননি। চালিয়ে যান নিজের অনুশীলন। ফলাফল হিসাবে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার সাথে সাথে জায়গা পান ২০১৯ বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়ার দলে। যদিও কোন সেঞ্চুরি ছাড়া চার ফিফটিতে ৩৮ গড়ে করেন ৩৭৯ রান। প্রত্যাশার তুলনায় ছিল পারফর্ম করতে পারেননি তিনি।

কিন্তু এরপরেই অপেক্ষা করছিলো ফিরে আসার মঞ্চ। তার খেলার অতি আপন আঙিনা, টেস্ট ক্রিকেট। ২০১৯ অ্যাশেজের এজবাস্টন টেস্ট দিয়ে শুরু করলেন নিজের প্রিয় ফরম্যাট টেস্টে। এজবাস্টনে অস্ট্রেলিয়া তার আগের ২৫ বছর কোন টেস্ট জিতেনি সাথে ছিল বর্মি আর্মির ব্যু। সকল চাপ মাথায় নিয়ে দলের বিপর্যয়ে এক দিক আগলে রেখে করেছিলেন অনবদ্য এক সেঞ্চুরি। পরের ইনিংসেও সেঞ্চুরি করে দুনিয়াকে জানান দিলেন তার পুনরাগমনী বার্তা।

লর্ডস টেস্টে তিনি পড়লেন অভিষিক্ত জোফরা আর্চারের প্রবল তোপের মুখে। এ টেস্টে স্মিথ-আর্চারের লড়াই মডার্ন টেস্ট ক্রিকেটের পোস্টার হয়ে থাকবে অনেকদিন। আর্চারের বলে প্রথমে কনুইতে আঘাত পেলেও খেলা চালিয়ে যান। তবে পরবর্তীতে মাথায় আঘাত পেলে আর মাঠে নামতে পারেননি। কিন্ত পরে আবার ফিরে এসেই এ ইনিংসে ৯২ করেন। তবে কনকাশনের জন্য ওই টেস্ট এবং পরের টেস্ট মিস করেন স্মিথ।

ফিরে আসেন চতুর্থ টেস্টে আর করেন ডাবল সেঞ্চুরি। এ সিরিজের আগে গণমাধ্যমে বলা তার এই উক্তিটার সত্যতা বজায় রাখেন। উক্তিটা ছিল এমন, "I hear people saying that Archer got the better of me. Oh, Did he? He got me injured obviously but he didn't get me out. Let's see if he can in next test."

এ অ্যাশেজ তিনি শেষ করেন ৭ ইনিংসে ৭৭৪ রান নিয়ে আর এভাবেই নিজের ফিরে আসাটা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা গল্প হিসেবে রেখে দেন।

স্পোর্টসমেইল২৪/পিপিআর

[sportsmail24.com এখন sportsmail.com.bd ঠিকানাতেও। খেলাধুলার ভিডিও-ছবি এবং  সর্বশেষ সংবাদ পড়তে ব্রাউজ করুন যেকোন ঠিকানায়। এছাড়া অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে ইনস্ট্রল করে নিতে আমাদের অ্যাপস ]


শেয়ার করুন :