মহামারীর বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট

স্পোর্টসমেইল২৪ স্পোর্টসমেইল২৪ প্রকাশিত: ১০:৩৭ পিএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০২০
মহামারীর বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেট

২০২০ সালটা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অনেক কিছু পাওয়ার। পুরো বছরটি ছিল টাইগারদের ঠাসা সূচিতে। তবে সব ভেস্তে গেছে। করোনার কারণে বছরটি ছিল টাইগারদের জন্য হতাশার। ব্যস্ত সূচির বিপরীতে পুরো বছরে মাত্র দু’টি টেস্ট খেলতে পেরেছে বাংলাদেশ। তবে রয়েছে কিছু ভালো সংবাদও। করোনা মহামারীর মধ্যেও বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপ জয় ছিল দেশের জন্য এ যাবতকালের সেরা অর্জন।

সুযোগ মিস করার বছর
বাংলাদেশের জন্য এ বছরটি ব্যস্ততম বছর হওয়ার কথা ছিল। কমপক্ষে দশটি টেস্ট ম্যাচ এবং বেশ কিছু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার কথা ছিল। তবে টাইগাররা হতাশ। কারণ, সাধারণত বেশি টেস্ট ম্যাচ খেলার যথেষ্ট সুযোগ পায় না তারা। বিশ্ব ক্রিকেটে বড়-বড় দল বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে আগ্রহী থাকে না।

করোনার কারণে বাংলাদেশের আটটি টেস্ট স্থগিত হয়েছে। তিনটি করে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে এবং দেশের মাটিতে দু’টি করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং সাথে বেশক’টি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিও। এ বছর বাংলাদেশ দু’টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও পাঁচটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে একটি টি-টোয়েন্টি পরিত্যক্ত হয়।

শুধুমাত্র জাতীয় দলই নয়, ২০২২ সালের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রস্তুতির জন্য বেশ কয়েকটি দেশে সফর এবং বেশ কয়েকটি দেশকে দেশের মাটিতে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা ছিল। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত না হওয়াতে তাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

মহামারীর কারণে বাংলাদেশ ‘এ’ দল ও নারী দলেরও বেশ কিছু সিরিজ স্থগিত হয়েছে। দেশের জনপ্রিয় ঘরোয়া আসর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) প্রথম রাউন্ডের পর পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এশিয়া একাদশ ও বিশ্ব একাদশের মধ্যকার টি-টোয়েন্টি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল বিসিবি। সেটিও করোনার কারণে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে।

সাফল্য-ব্যর্থতা
২০২০ সালে তিন ফরম্যাটে ১০টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। দু’টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও দু’টি টি-টোয়েন্টি। এর মধ্যে একটি টেস্টে পাকিস্তানের কাছে ইনিংস ও ৪৪ রানে হেরেছে তারা। টানা চার ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হারের লজ্জা পায় টাইগাররা। তবে ঘুড়ে দাঁড়াতে সময় নেয়নি বাংলাদেশ। মুশফিকুর রহিমের তৃতীয় ডাবল-সেঞ্চুরিতে সিলেটের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস ও ১০৬ রানে সিরিজের একমাত্র ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ। সেটি ছিল দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের ইনিংস ব্যবধানে জয়। আর ১১৯ ম্যাচে ১৪তম টেস্ট জয়।

এরপর তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় সিরিজের টানা চতুর্থবারের মতো জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। তিন ম্যাচের ওই সিরিজে বাংলাদেশের জয়ের চিত্র ছিল যথাক্রমে ১৬৯, ৪ ও ১২৩ রানে। প্রথম ওয়ানডেতে ১৬৯ রানের জয় বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে রান ব্যবধানে বড় জয় ছিল।

ওয়ানডের পর টি-টোয়েন্টি সিরিজেও জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। দু’টি ম্যাচ যথাক্রমে ৪৮ রান ও ৯ উইকেটে জিতে তারা। তার আগে পাকিস্তানের মাটিতে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-০ ব্যবধানে হারে বাংলাদেশ। তৃতীয় ও শেষ ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়, ফলে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা থেকে রক্ষা পায় টাইগাররা।

পাকিস্তান সফর
অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এ বছরের শুরুতে পাকিস্তান সফরে যায় বাংলাদেশ। ১২ বছর পর পাকিস্তান সফরের আগে সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা দল। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে যে ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তা কেবল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী পেয়ে থাকেন।

সিরিজের জন্য সফরটি তিন ধাপে ভাগ হয়েছিল। প্রথম ধাপে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। যেটিতে বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে হারে। জানুয়ারিতে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষে ফেব্রুয়ারিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচের জন্য সফর করে বাংলাদেশ। লংগার ভার্সনের সিরিজটি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের অংশ।

প্রথম টেস্টটি ইনিংস ও ৪৪ রানে হারে বাংলাদেশ। পাকিস্তান সফরের তৃতীয় ও শেষ ধাপে বাকি একটি করে টেস্ট ও ওয়ানডে খেলতে যাওয়ার কথা ছিল টাইগারদের। তবে করোনা কারণে থমকে যায় বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন।

প্রথমবারের মতো আইসিসির কোন ট্রফি জয়
২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারিে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জনের স্বাদ নেয় বাংলাদেশ। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়রা আইসিসি বিশ্বকাপ জয় করে। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের ফাইনালে ভারতকে ৩ উইকেটে হারায় বাংলাদেশ। ফলে প্রথমবারের মতো আইসিসির কোন ট্রফি জিততে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলে বাংলাদেশের যুবারা। চার বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে অবিস্মরনীয় জয় তুলে নেয় আকবরের দল। এ দলটিই এর আগে, ইংল্যান্ড ও এশিয়া কাপে দু’টি ত্রিদেশীয় ফাইনালে তাদেরকে হারিয়েছিল।

ট্রফি নিয়ে দেশে ফেরার পর আকবর-হৃদয়দের বীরের মতো সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারদের বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যত হিসেবে অভিহিত করে বিসিবি। ইতোমধ্যে আকবরসহ বেশ কিছু ক্রিকেটার ঘরোয়া আসরে সাকিব-তামিম-মুশফিকদের জায়গা পূরণ করার মতো পারফরমেন্স করেন।

তামিমের প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি
বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরি করেন জাতীয় দলের ওপেনার তামিম ইকবাল। এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডে ইসলামি ব্যাংক ইস্ট জোনের হয়ে খেলে অপরাজিত ৩৩৪ রান করেন তামিম। দেশে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এটিই কোন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। এর আগে রকিবুল হাসান ৩১৩ রান করেছিলেন।

করোনার মধ্যেও সজাগ ছিলেন ক্রিকেটাররা
করোনা বিশ্বকে থমকে দিলেও ঘরে বসে থাকেননি ক্রিকেটাররা। বিসিবির দেওয়া গাইডলাইনে অনুশীলন করে গেছেন তারা। পাশাপাশি অসহায়-দুস্থদের সহায়তায়ও এগিয়ে এসেছিলেন ক্রিকেটাররা। জাতীয় ক্রিকেটার, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার, নারী ক্রিকেটার ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা তাদের বেতন থেকে অর্থ প্রদান করে তহবিল গঠন করেন। কিছু ক্রিকেটার, যেমন- মাশরাফি বিন মর্তুজা, নাজমুল ইসলাম অপু করোনায় আক্রান্ত হন। তারা অসহায়-দুস্থদের সহায়তায় সোচ্চার ছিলেন।

শিরোনামে সাকিব
ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ক্রিকভাজের সাথে উইজডেন ম্যাগাজিন যৌথভাবে ওয়ানডেতে সবচেয়ে মূল্যবান ক্রিকেটার ও টেস্টের ষষ্ঠ সেরা খেলোয়াড় হিসেবে সাকিবকে বেছে নেন। আইসিসির এক দশকে সেরা ওয়ানডে একাদশেও নাম আছে সাকিবের।

তবে এ বছরের অধিকাংশ সময়ই আইসিসির কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিলেন সাকিব। জুয়াড়ির তথ্য গোপন করায় আইসিসি তাকে নিষিদ্ধ করে। তাই বছরজুড়েই শিরোনামে ছিলেন সাকিব। তবে করোনা তার জন্য আশীর্বাদ হয়েই এসেছিল। এ জন্য অনেকগুলো ম্যাচ মিস করতে হয়নি সাকিবকে। গত ২৮ অক্টোবর সাকিবের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়। ফলে ক্রিকেটে ফিরতে আর কোন বাঁধা থাকেনি তার। এতে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে জেমকন খুলনার হয়ে মাঠে নামেন সাকিব।

নারী ক্রিকেটারদের জন্য হতাশার বছর
করোনার কারণে দেশের ক্রিকেট থমকে যাওয়া আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্য পেয়েছিল পুরুষ দল। তবে নারীদের দলের জন্য বছরটি হতাশার ছিল। এ বছর তারা কেবল মাত্র চারটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে পেরেছে। নারীদের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের ওই চার ম্যাচে কোন জয়ের স্বাদ পায়নি বাংলাদেশ।

ভারতের কাছে ১৮ রানে, অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৮৬ রানে ও নিউজিল্যান্ডের কাছে ১৭ রানে ম্যাচ হারে বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে ৯ উইকেটে হারে নারী দল। পুরো আসরে ব্যাট হাতে বাজে পারফরমেন্স ছিল নারী দলের ক্রিকেটারদের। কোন ব্যাটসম্যানই হাফ-সেঞ্চুরি করতে পারেননি।

বিসিবি প্রেসিডেন্ট’স ও বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ
করোনার মধ্যে সাহসিকতার সাথে দু’টি টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিল বিসিবি। ক্রিকেটকে মাঠে ফেরাতে টুর্নামেন্ট দু’টি বিসিবির বড় উদ্যোগের অংশ। এ দু’টি টুর্নামেন্ট জুড়ে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা এবং অন্যান্য স্টোকহোল্ডারদের জৈব-সুরক্ষা পরিবেশে রাখা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা হিসেবে জৈব-সুরক্ষা পরিবেশ কীভাবে কাজ করে সেটি দেখাই প্রধান লক্ষ্য ছিল বিসিবির।

কোন সমস্যা ছাড়াই পরিকল্পনা অনুযায়ী দু’টি টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন করে বিসিবি। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে ৫০ ওভারের টুর্নামেন্টে তিনটি দল মাহমুদউল্লাহ একাদশ, তামিম একাদশ ও নাজমুল একাদশ অংশ নেয়। ফাইনালে নাজমুল একাদশকে ৭ উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় মাহমুদউল্লাহ একাদশ।

বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে পাঁচটি দল অংশ নেয়। এখানেও মাহমুদউল্লাহর নেতৃত্বাধীন খুলনা চ্যাম্পিয়ন হয়। ফাইনালে গাজী গ্রুপ চট্টগ্রামকে ৫ রানে হারিয়ে শিরোপার স্বাদ নেয় তারা। দু’টি টুর্নামেন্টেই বড় অংকের প্রাইজমানি দেওয়া হয়েছিল।

[sportsmail24.com এর ওয়েবসাইট এখন sportsmail.com.bd ঠিকানাতেও ব্রাউজ করে পড়তে পারবেন। এছাড়া অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনে স্পোর্টসমেইল২৪.কমের অ্যাপস থেকেও খেলাধুলার সকল নিউজ পড়তে পারবেন। ইনস্ট্রল করুন স্পোর্টসমেইল২৪.কমের অ্যাপস ]


শেয়ার করুন :


আরও পড়ুন

স্টেডিয়ামের নাম পাল্টে শহীদুলকে সম্মান জানালো ওভাল

স্টেডিয়ামের নাম পাল্টে শহীদুলকে সম্মান জানালো ওভাল

মাহমুদউল্লাহ’র হাতে ঘরোয়া ক্রিকেটের ডাবল শিরোপা

মাহমুদউল্লাহ’র হাতে ঘরোয়া ক্রিকেটের ডাবল শিরোপা

টি-টোয়েন্টির যে রেকর্ডে সাকিবের আগে মাত্র দু’জন

টি-টোয়েন্টির যে রেকর্ডে সাকিবের আগে মাত্র দু’জন

অধিনায়কত্বের চাপ মিডিয়ায় বানানো : তামিম

অধিনায়কত্বের চাপ মিডিয়ায় বানানো : তামিম