এক সময়ের জমজমাট স্টেডিয়াম এখন পরিত্যক্ত!

শাহীন রহমান শাহীন রহমান প্রকাশিত: ০৬:০৭ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
এক সময়ের জমজমাট স্টেডিয়াম এখন পরিত্যক্ত!

এক সময় স্টেডিয়ামটিতে নিয়মিত ফুটবল-ক্রিকেটের টুর্নামেন্ট আয়োজন হতো। হাজারও দর্শকে মুখর থাকতো চারদিক। অথচ এখন মাঠ জুড়ে নোংরা-আবর্জনার দুর্গন্ধে ভরা। হালকা বৃষ্টিতেই পরিণত হয় জলাভূমিতে, চলে মাছ ধরার উৎসব! শুধু তাই নয়, গাড়ি রাখা ছাড়াও স্টেডিয়ামেটি পরিণত হয়েছে যেন পাবলিক টয়লেটে!

এমন চিত্র পাবনার বেড়া পৌর এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘শহীদ আব্দুল খালেক স্টেডিয়াম’র। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়ামটি এখন পরিত্যক্ত! সারাদেশে যেখানে মাঠ সংকট সেখানে স্টেডিয়ামটি দেখার যেন কেউ নেই!

শহীদ আব্দুল খালেক স্টেডিয়ামের অবস্থান বেড়া পৌর এলাকার কাগমাইরপাড়া মহল্লার বেড়া ফাযিল মাদ্রাসার পাশে। বেড়া উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণ বলতে এই মাঠটিকেই বোঝানো হয়। এটি শুধু বেড়া উপজেলারই নয়, আশেপাশের কয়েক উপজেলার সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ।
sportsmail24

বেড়াবাসী দীর্ঘদিন ধরে এই মাঠে গ্যালারি স্থাপনের দাবি জানিয়ে এলেও তা উপেক্ষিতই থেকে গেছে বরাবর। অথচ অতীতে স্টেডিয়ামটিতে গ্যালারি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য-মন্ত্রীরা। তবে মাঠে গ্যালারি না থাকলেও এর চারদিকে দাঁড়িয়ে-বসে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার দর্শক খেলা দেখতে পারেন।

স্টেডিয়ামটি নিয়ে এলাকাবাসী জানান, স্টেডিয়ামটি স্থাপনের পর এখানে নিয়মিতভাবে দেশের বড় বড় দলের অংশগ্রহণে ফুটবল প্রতিযোগিতার আয়োজন হতো। হাজার হাজার মানুষ টিকিট কেটে সেই প্রতিযোগিতা উপভোগ করেছেন। এছাড়া বছর জুড়েই আশেপাশের এলাকার ক্রীড়াবিদরা মাঠটিতে বিভিন্ন খেলাধুলার চর্চা করে থাকেন। সারা বছরই মাঠ থাকতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং খেলার উপযোগী।
sportsmail24

তবে গত কয়েক বছর ধরে মাঠ সংস্কার ও পরিচ্ছন্ন না রাখায় এখন প্রায় পরিত্যক্ত! স্টেডিয়ামের প্রধান ফটক ভাঙ্গা, গেট খোলা থাকায় আশেপাশের লোকজন ময়লা আবর্জনা ফেলা ছাড়াও মলত্যাগও করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা বর্ষা মৌসুমে মাঠের পানি বের না হওয়ার পাশাপাশি পাশের মহল্লার নোংরা পানি ঢুকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। বছরের প্রায় চার মাস মাঠে দুই থেকে তিন ফুট পানি জমে থাকায় খেলাধুলা তো দূরের কথা, রীতিমত চলে মাছ ধরার উৎসব।

এলাকাবাসীরা আরও জানান, এক সময় নিয়মিতভাবে যেখানে খেলাধুলা হতো সেখানে গত ১৫-২০ বছর ধরে কোন টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়নি। দুই থেকে পাঁচ বছর বিরতি দিয়ে কয়েকটা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলেও পানির সাথে নোংরা-আবর্জনা মিশে গোটা স্টেডিয়ামটাই এখন এক ধরনের পাবলিক টয়লেটে পরিণত হয়েছে! যেখানে কোন প্রতিযোগিতা আয়োজন এমনকি শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা করার মতো পরিবেশও নেই।
sportsmail24

এলাকাবাসীর কথা সাথে সরেজমিনে গিয়ে মিল পাওয়া যায়। মাঠে প্রবেশের প্রধান ফটকে ঢুকতেই প্রস্রাবের অসহ্য গন্ধে যে কারো বমি আসার মতো অবস্থা হবে। মাঠের প্রবেশপথ থেকে একটু ভিতরেই অঘোষিত পাবলিক টয়লেট! খেলো মাঠেই যে কেউ মল-মূত্র ত্যাগ করছেন।

বড় বড় ঘাসে ভরে গেছে মাঠ। বৃষ্টির পানিতে এখনো ভেতরের প্রায় পুরো মাঠজুড়ে জলাবদ্ধতা। মাঠের অল্প যে জায়গাটুকু শুকনো রয়েছে সেখানেও পরিণত হয়েছে এলাকার ট্রাকমালিকদের অঘোষিত ট্রাকস্ট্যান্ড!
sportsmail24

খেলাধুলার ভরপুর থাকা এক সময়ের ব্যস্ত এই স্টেডিয়ামটি নিয়ে মনজুর কাদের মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসের শিক্ষক মনোয়ার হোসেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “এই মাঠে প্রায় ১৫ হাজার দর্শক ফুটবল খেলা দেখতে পারতেন। আমার মনে আছে, প্রায় ৩০ বছর আগে আমরা একটি টুর্নামেন্টে ১১ হাজার টিকিট বিক্রি করেছিলাম। প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল তিন টাকা। আরও হাজার চারেক শিক্ষার্থী বিনা টিকিটে খেলা উপভোগ করেছিল। অথচ আজ এই মাঠের বেহাল চিত্র দেখে বুকটা হাহাকার করে ওঠে।”

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) তালিকাভূক্ত রেফারি শাহনেওয়াজ সাগরের বাড়ি স্টেডিয়ামটির একেবারে কাছে। তিনিও আক্ষেপ করে বলেন, “কয়েক উপজেলার ক্রীড়াঙ্গণের প্রাণকেন্দ্র হলো এই স্টেডিয়াম। এর এমন বেহাল দশা কোনোভাবেই মেনে যায় না। এই মাঠে বেড়ার অসংখ্য শিশু-কিশোর সকাল-বিকাল ফুটবল-ক্রিকেটসহ নানা খেলাধুলায় অংশ নিত। মাঠের অভাবে তারা এখন মোবাইলে আসক্ত হচ্ছে। এমনকি কেউ কেউ নেশার জগতেও চলে যাচ্ছে। অবিলম্বে মাঠটির সংস্কার কাজ শুরু করা দরকার।”
sportsmail24

মাঠটির দেখভালের দায়িত্ব উপজেলা পরিষদের। স্টেডিয়ামটি নিয়ে বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোরশেদুল ইসলাম বলেন, “মাঠটি নিচু বলে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে পানি নিস্কাশনের উপায় খোঁজা হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য সমস্যাগুলোরও সমাধান করে মাঠটি যাতে দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সে ব্যাপারে আমরা চেষ্টা করছি।”



শেয়ার করুন :